Publications

বাংলাদেশের শিক্ষা

জ্ঞান হোক উন্মুক্ত- সবার জন্য

কেমন হবে একুশ শতকের শিক্ষা?

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী: মানব সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। একটি জাতি কেমন উন্নত তা নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। এই পৃথিবীতে সব কিছুই পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের সাথে শিক্ষাব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। একটি দেশের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সে দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করে। তাই্ আধুনিক বিশ্বে দেখা যায় শিক্ষাখাতে তাদের বরাদ্ধ সবচেয়ে বেশি। মানুষের মস্তিষ্ক একটি সুপার কম্পিউটারের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী। আশা করা যায়, একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হবে যে, মানুষ প্রযুক্তির সহায়তায় তার এই উর্বর মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌছবে।

একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে গতি এসেছে সর্বত্র। এই গতি দরকার পাঠ্যপুস্তকেও। শিক্ষার্থীর মননের গতির সাথে তাল মিলিয়ে পাঠ্যপুস্তকে গতি না আনতে পারলে শিখন-শেখানো কার্যক্রম ফলপ্রসু হবে না। তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মানুষের চিন্তা ও জ্ঞানের মিথস্ক্রিয়া ঘটবে। জ্ঞানের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে মোট জ্ঞানের পরিমাণ খুব দ্রুত বেড়ে যাবে। পূর্বে যেখানে জ্ঞানের পরিমাণ বাড়তে হাজার বছর লাগতো, বর্তমানে সেখানে জ্ঞানের পরিমাণ বাড়তে প্রয়োজন হবে মাত্র এক মাস।

একুশ শতকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন হওয়া উচিত?
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশের আমুল পরিবর্তন ঘটবে। একুশ শতকের বিদ্যালয়গুলো হবে তথ্যপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ। প্রতিটি বিদ্যালয়ে থাকবে ডিজিটাল লাইব্রেরি। সমস্ত বই থাকবে পিডিএফ ফরমেটে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদেরকে বইপুস্তক আনতে হবে না। শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বেঞ্চের সাথে লাগানো থাকবে কম্পিউটার। শিক্ষার্থীরা এখানে বসে কম্পিউটার চালু করেই পড়াশুনা শুরু করবে। তাদের এই কম্পিউটারে থাকবে ইন্টারনেটের সুবিধা। এই কম্পিউটার থেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল দেশের শিক্ষার্থীরা কী শিখছে তা সে ইচ্ছা করলেই দেখতে পারবে। এই শিক্ষার্থীরা হবে গ্লোবাল ভিলেজের অর্ন্তগত। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কোন সিলেবাসের পরীক্ষা দিয়ে সেই সার্টিফিকেট অজর্ন করেতে পারবে। অর্থাৎ শিক্ষা কোনো দেশের ভৌগলিক সীমারেখায় আবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষার দ্বার হবে উন্মুক্ত।

কেমন হবে একুশ শতকের শিক্ষকরা?
একুশ শতকের শিক্ষকরা হবেন তথ্যপ্রযুক্তিতে তারা খুবই পারদর্শী। এই শিক্ষকগণ প্রযুক্তির কল্যাণে একই সময় লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে পড়াতে সক্ষম হবেন। তারা ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ ইত্যাদিতে লিখবেন। প্রতিটি শিক্ষকের থাকবে ব্যক্তিগত ওয়েব সাইট। এই সাইটে তাঁরা তাদের প্রতিদিনের লেকচারগুলো আপলোড করবেন। কোন কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে ব্যর্থ হয় তবে সে এখান থেকে ডাউনলোড করে সেই বিষয়টি শিখে নিতে পারবে। একুশ শতকের শিক্ষকের দায়িত্ব হবে শিক্ষার্থীর ভেতর সৃজনশীলতা সৃষ্টি করা। শিক্ষকরা কারিকুলাম ও টেকনোলজির মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন।

কেমন হবে একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা?
একুশ শতকে শিক্ষার্থীদেরকে বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে স্কুলে যেতে হবে না। তাদের বইগুলো হবে ডিজিটাল। মোবাইলের ছোট একটা মেমোরি কার্ডের মধ্যে তাদের সারাজীবনের পাঠ্যবইগুলো পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারবে। একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্য বইপড়েই শিখবে না। তাদের শেখার উৎস হবে বহুমাত্রিক। যেমন- পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ব্লগ ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরা এসব মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তত্ত্ব, তথ্য শিক্ষকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে। সুতরাং এক্ষেত্রে শিক্ষক যদি এই সমস্ত মাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ঠ না থাকেন, তবে শিক্ষার্থীর সাথে শিক্ষকের মিথষ্ক্রিয়া হবে না। তাই শিক্ষককে অবশ্যই এই মাধ্যমগুলোর পরিচিত হতে হবে। শিক্ষার্থীরা হবে ডিজিটাল লার্নার। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষককেও ক্রিয়েটিভ হতে হবে।

একুশ শতকের শিক্ষায় কী কী পড়ানো উচিত?
একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এই সিলেবাস হবে গবেষণাধর্মী। তারা যেহেতু গ্লোবাল সিটিজেনের সদস্য হবে সেহেতু তাদেরকে শিখতে হবে কী করে সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। একুশ শতকের শিক্ষার্থীর সিলেবাসে থাকবে এমন কিছু যা শিক্ষার্থীকে চিন্তা করতে শেখাবে এবং সমস্যা সমাধানে পারদর্শী করবে। তাদের সিলেবাসে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করার দক্ষতা অর্জন করার কৌশল অর্ন্তভুক্ত থাকবে।

আনন্দের সাথে শিখবে শিক্ষার্থীরা
একুশ শতকের শিক্ষায় শিক্ষার্থী আনন্দের সাথে খেলতে খেলতে শিখবে। এরকম একটি নমুনা আমরা দেখতে পারি http://www.champs21.com-এ। এই সাইটে শিক্ষার্থীরা খেলার মধ্য দিয়ে নিজের অজান্তেই গণিত শিখে যাচ্ছে। কোনো গেইম খেলে শিখছে যোগ বিয়োগ, আবার কোনো গেইম খেলে বীজগণিত বা জ্যামিতি।

একুশ শতকের শিক্ষায় বিমূর্ত বলতে কিছু থাকবে না। শিক্ষার সব কিছুই শিক্ষার সব কিছুই শিক্ষার্থীর কাছে মূর্ত হবে। প্রযুক্তি মানুষকে আশ্চর্যজনকভাবে সুযোগ করে দিচ্ছে কোনো কিছু করার জন্য। আমাদেরকে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য এই সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া যদি হয় আনন্দজনক, তবে শিক্ষার্থীরা অতি সহজেই অল্প সময়ে অনেক কিছু শিখে ফেলতে পারবে।

শ্রেণীকক্ষে চলবে অংশগ্রহণ পদ্ধতির শিখন-শেখানো কার্যক্রম
একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থা হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, শিক্ষককেন্দ্রিক নয়। শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার করা হবে কম্পিউটার,মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ইন্টারনেট। ফলে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিপূর্ণতা লাভ করবে ও আনন্দজনক হবে। এখানে শিক্ষকগণ পাঠদান করবেন না। শিক্ষকগণ শিখন-শেখানো কার্যক্রমে গাইডের ভূমিকা পালন করবেন। শিক্ষার্থীরা যে তথ্যগুলো বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত হবে, তা নিয়েই তারা শিক্ষকের সাথে আলোচনা করবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে আলোচনার মাধ্যমে সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনে সাহায্য করবেন। শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে শেখাবেন কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়। শুধু তথ্য মুখস্থ নয়। তথ্য দিয়ে কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয় এইটিই হবে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে কনফুসিয়াস বলেছেন Learning without thinking is useless. অর্থাৎ চিন্তাবিহীন শিক্ষা কোনো কাজে আসে না। একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা হবে মুক্তচিন্তার অধিকারী। তারা তাদের চিন্তাগুলো শিক্ষকের চিন্তার সাথে মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

একুশ শতকের শিক্ষা হবে প্রযুক্তিনির্ভর
একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব মানব সভ্যতার গতি ও প্রকৃতি দ্রুত বদলে দিতে পারে। দেশ,জাতি ও মানব সভ্যতাকে নিয়ে যেতে পারে উন্নতির চরম শিখরে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষাব্যয় কমে যাবে নাটকীয়ভাবে। তখন যে কোনো পেশার মানুষের কাছে যে কোনো ধরনের শিক্ষাগ্রহণ করা সহজ হয়ে যাবে। শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেল চালু করা হবে। সেই চ্যানেলে রুটিন অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন বিষয় শিক্ষকগণ পড়াবেন। এই অনুষ্ঠানগুলো প্রচারিত হবে সরাসরি। ফলে শিক্ষার্থীরা কোনোকিছু না বুঝলে তৎক্ষণাৎ শিক্ষককে ফোন করে জেনে নিতে পারবে। এতে একজন শিক্ষার্থী কোনো কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না যেতে পারলেও সে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। নামকরা শিক্ষকদের থাকবে ব্যক্তিগত ওয়েব সাইট। এখানে সেই শিক্ষকের ভিডিও লেকচারগুলো দেয়া থাকবে। কোনো শিক্ষার্থী ইচ্ছা করলেই তা যে কোনো সময় ডাউনলোড করে শিখতে পারবে। আবার সে ইচ্ছা করলে এটা দোকান থেকে কিনতেও পারবে।

একুশ শতকে চালু হবে ভার্চুয়াল শিক্ষা
এ যেন এক কল্পনার জগৎ। শিক্ষার্থী ক্লিক করেই প্রবেশ করবে তার শেখার জগতে। এ এক অসীম জায়গা। এখানে বিমূর্ত বলে কিছু নেই। বিমূর্ত সব কিছুই মূর্ত হয়ে তার সামনে ভেসে আসবে। শিক্ষার্থীর কল্পনার জগত হবে উন্মুক্ত। এখানে অসম্ভব বলে বিছুই নেই। শিক্ষার্থী সেই জগতের সব কিছু নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পাবে। থাকবে উন্নত পরীক্ষাগার আর যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল। শিক্ষার্থীরা এই ভার্চুয়াল যন্ত্রপাতি আর ভার্চুয়াল ক্যামিকেল দিয়েই তার গবেষণা করবে। শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা হবে ভার্চুয়াল রোবট শিক্ষক। এই শিক্ষকের মেমোরিতে থাকবে নানা ধরনের এনসাইক্লোপিডিয়া। ভার্চুয়াল রোবট শিক্ষক হবে শিক্ষার্থীর বন্ধু। এই রোবট শিক্ষক শিক্ষার্থীকে গাইড করবে। ফলে কোনো পাঠ বোঝার জন্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের কাছে যেতে হবে না। এই শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর সময় অর্থ দুটোই বাঁচবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে শুরু হয়েছে ভার্চুয়াল শিক্ষাব্যবস্থা। যা ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের মাঝে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে আমাদের পিছিয়ে থাকলে চলবে না। তবে সুখের কথা এই যে আমাদের দেশের ডিজিটাল এডুকেশনের পথিকৃত http://www.champs21.com এই ভার্চুয়াল এডুকেশনের কাজ শুরু করে দিয়েছে।

একুশ শতকের শিক্ষা হবে স্থান-কাল-পাত্রের উর্দ্ধে
একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিখবে না। শিখবে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টেলিভিশন, মোবাইল,পত্রিকা ইত্যাদি যে কোনো উৎস থেকে। যে কোনো বয়সে,যে কোনো সময় শেখার দ্বার তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শেখার জন্য তাকে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না। যাতায়াতের জন্য তার কোনো সময় বা টাকা খরচ করতে হবে না। নিজের ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে পারবে। আর যে কোনো বিষয় শেখার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক যেন তাকে শেখানোর জন্য বসেই আছেন। একটু কষ্ট করে ক্লিক করলেই তিনি শেখাতে শুরু করে দিবেন। যতবার খুশি শিক্ষার্থী শিখতে চাইবে তিনি ততবার বলবেন। কখনোই বিরক্ত হবেন না এই শিক্ষক।

একুশ শতকের শিক্ষা হতে হবে সবার জন্য
একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থা হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে ধনী-গরীব ভেদাভেদ থাকবে না। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাকে সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। তবেই মানবজাতি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ একজন মেধাবী মানুষ যদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ঠ অনেক মানুষই তাঁর প্রতিভার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হবে। একটি উদাহরণ থেকে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যাবে। একজন রবীন্দ্রনাথ যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকতেন, তাহলে আমরা তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে বঞ্চিত থাকতাম। নিউটন যদি একটি দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করতেন, তবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্বন্ধে চিন্তা করার আগেই আপেলটি গলধকরণ করে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতেন। স্টিফেন হকিন্স আমাদের দেশে ভিক্ষুকের ঘরে জন্মগ্রহণ করলে তাকে নিশ্চিত ভিক্ষা করতে হত। অর্থাৎ শিক্ষা থেকে একজন মানুষ বঞ্চিত হলে শুধু ঐ মানুষটিই বঞ্চিত হবে না; তার সাথে বঞ্চিত হতে পারে লাখ লাখ মানুষ। প্রতিটি জাতির মধ্যেই প্রতিভাবান মানুষ জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই এই প্রতিভাবানদের লালন করতে পারে না। যারা পারে তারাই উন্নতির চরম শিখরের দিকে এগিয়ে যায়। সুতরাং প্রতিটি মানুষকেই শিক্ষাক্ষেত্রে সমান সুযোগ দিতে হবে।

আমাদের করণীয়
আমাদের দেশে একুশ শতকের মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার জন্য এখনই বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ইন্টারনেট সংযোগ দিতে হবে। শিক্ষকদের ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করার সুযোগ দেয়ার জন্য তাদের প্রতিদিনের ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইসিটি উপকরণগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য একজন ট্রাবলশুটার নিয়োগ দিতে হবে। যে সমস্ত শিক্ষক আইসিটি ব্যবহার করে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করবেন তাদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থা করেতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য শেখার দ্বার উম্মোচন করতে হবে। শিক্ষা যাতে কোনো বয়স ও সময়ের শৃঙ্খলে আবদ্ধ না থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী: প্রভাষক, অগ্রণী স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা-১২০৫।

 Web Link: http://www.bn.bdeduarticle.com/%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%A8-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87/

 

Prothom Aloঢাকা, শনিবার, ৩১ আগস্ট ২০১৩, ১৬ ভাদ্র ১৪২০, ২৩ শাওয়াল ১৪৩৪

জীববিজ্ঞান বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে যেভাবে প্রস্তুতি নেবে

প্রভাষক, অগ্রণী স্কুল ও কলেজ, ঢাকা
প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, শুধু বিষয় সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা থাকলেই বেশি নম্বর পাওয়া যায় না। বেশি নম্বর পেতে হলে দরকার কিছু কৌশল। কৌশল আর অধ্যাবসায়—এই দুয়ের সমন্বয় ঘটলেই সাফল্য এসে ধরা দেবে তোমাদের হাতে।
চিহ্নিত চিত্র আঁকবে কীভাবে: জীববিজ্ঞানে চিত্রের প্রতি তোমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ অনেক প্রশ্নের উত্তরে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ নম্বর চিত্রের জন্য বরাদ্দ থাকে। পরীক্ষার খাতায় চিত্র অবশ্যই চিহ্নিত করবে। আর চিত্রের নিচে কিসের চিত্র এঁকেছ তা লিখতে কিন্তু ভুলবে না। চিত্র চিহ্নিত করার জন্য যে লাইনগুলো টানবে, তা অবশ্যই সমান্তরাল করে টানবে। লেবেলিংয়ের লাইনগুলো যাতে একে অপরকে ছেদ না করে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। লেবেলিংয়ের লেখাগুলো অবশ্যই পেনসিল দিয়ে লিখবে। চিত্র অবশ্যই পরিষ্কারভাবে পেনসিল (2B/HB) দিয়ে আঁকবে। চিত্রে রংপেনসিল ব্যবহার করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, চিত্র রং করার জন্য কোনো আলাদা নম্বর বরাদ্দ থাকে না। পেনসিল দিয়ে চিত্র আঁকলে সেটি সহজেই ইরেজার দিয়ে মুছে ঠিক করতে পারবে, কিন্তু কলম বা রংপেনসিল দিয়ে আঁকলে সেটি আর ঠিক করা যাবে না। তোমার চিত্রটি অবশ্যই মোটামুটি বড় হতে হবে এবং চিত্রটিতে সব অঙ্গাণু সবিস্তারে আঁকতে হবে। চিত্রটিতে অঙ্গাণুগুলোর/অংশগুলোর আকৃতি সঠিক অনুপাতে হতে হবে। তবেই চিত্রে ভালো নম্বর পাওয়া যেতে পারে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণ নম্বরের উত্তর করবে কীভাবে:
পরীক্ষায় ৭৫ নম্বরের পুরো উত্তর করার জন্য তোমাকে অবশ্যই কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তোমরা জানো যে ৭৫ নম্বরের জন্য নির্ধারিত সময় হচ্ছে ১৮০ মিনিট। আর সেই হিসাবে প্রতি নম্বরের জন্য বরাদ্দ সময় হলো ২.৪ মিনিট। তাই ৫ নম্বরের জন্য বরাদ্দ সময় হলো ১২ আর ১০ নম্বরের জন্য ২৪ মিনিট। তবে পরীক্ষার প্রশ্ন নানা ধরনের হয়ে থাকে। কিছু প্রশ্নের উত্তর খুব কম সময়ে দেওয়া যায়, আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর লিখতে অনেক সময় লাগে। এ বিষয়টি খেয়াল রেখে তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে তুমি কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দেবে। যেমন—একটি ৫ নম্বরের পার্থক্যের প্রশ্নের উত্তর লিখতে তোমার হয়তো পাঁচ মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু ৫ নম্বরের বর্ণনামূলক উত্তর লিখতে সময় লাগবে ১৫ মিনিট। কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর অনেক বেশি জানলেই সবটুকু লেখা যাবে না। তোমাকে লিখতে হবে উত্তরের জন্য বরাদ্দ নম্বর এবং সময়ের কথা বিবেচনা করে। তা না হলে তুমি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণ নম্বরের উত্তর করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, খুব ভালো করে ৬০ নম্বরের উত্তর করার চেয়ে মোটামুটিভাবে ৭৫ এর উত্তর করলে বেশি নম্বর পাওয়া যায়।
প্রশ্নের উত্তর কতটুকু হবে: প্রশ্নের উত্তর কতটুকু হবে, এটি নির্ভর করে প্রশ্নের ধরনের ওপর। তবে বর্ণনামূলক প্রশ্নের ক্ষেত্রে পাঁচ নম্বরের জন্য ২ পৃষ্ঠা লেখা উচিত। প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় খেয়াল করবে, প্রশ্নের মধ্যে কতগুলো অংশ আছে। এই অংশগুলো ধরে ধরে উত্তর করতে হবে। তবে তোমাকে অবশ্যই নম্বর এবং সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করেই উত্তর করতে হবে। অনেক বেশি জানলেই বেশি লেখা যাবে না। অন্যদিকে তোমাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, একটি প্রশ্নের মধ্যে অনেকগুলো অংশ থাকে এবং এই অংশগুলোর জন্য আলাদা করে নম্বর বরাদ্দ থাকে, যেগুলো সাধারণত প্রশ্নের মধ্যে লেখা থাকে না। যেমন: প্রশ্ন—একক পর্দা কী? কোষ পর্দা গঠনে ‘ফ্রুইড মোজাইক’ মডেল বর্ণনা করো। এখানে পুরো উত্তরের জন্য ৫ নম্বর থাকে। কিন্তু পরীক্ষক যখন উত্তরপত্র পরীক্ষণ করবেন, তখন নম্বর দেবেন এভাবে—(সংজ্ঞা:১+বর্ণনা:২.৫+চিহ্নিত চিত্র:১.৫=৫)। সুতরাং প্রশ্নের উত্তর করার সময় এই ভাগগুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। এখানে প্রশ্নে চিত্রের কথা না থাকলেও চিত্রের জন্য নম্বর বরাদ্দ আছে।
কী কী কারণে নম্বর কাটা যায়: তোমরা প্রশ্নের উত্তর লেখার শুরুতেই প্রশ্নের নম্বর [যেমন: ১নং প্রশ্নের উত্তর (ক)] লিখে নিচে কালো বা নীল রঙের সাইনপেন দিয়ে দাগ দেবে, যাতে প্রশ্নের নম্বর পরীক্ষকের চোখে পড়ে। মনে রাখবে, এখানে ভুল হলে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ তুমি যদি ১নং প্রশ্নের উত্তর (ক)-এর স্থলে ২নং প্রশ্নের উত্তর (ক)-এর উত্তর লেখো, তাহলে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। জীববিজ্ঞান বিষয়ে বৈজ্ঞানিক নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি হাতে লিখলে অবশ্যই এর নিচে আলাদাভাবে দাগ দিতে হবে। আর শ্রেণীবিন্যাস লেখার সময় গণ ও প্রজাতি দুটোর নিচেই আলাদাভাবে দাগ দিতে হবে। বৈজ্ঞানিক নামের নিচে দাগ না দিলে ০.৫ নম্বর কাটা যায়।
প্রশ্নের উত্তরে পুরো নম্বর পাওয়া যাবে যেভাবে: তোমাদের অনেকেরই ধারণা, জীববিজ্ঞানে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায় না। এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। জীববিজ্ঞানে অনেক প্রশ্ন আছে যেগুলো নির্ভুলভাবে উত্তর করলে পুরো নম্বর পাওয়া যায়। যেমন শ্রেণীবিন্যাস, বৈজ্ঞানিক নাম, পার্থক্য, বিভিন্ন ধরনের ছক ইত্যাদি। তবে বর্ণনামূলক প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর অনেক লিখলেও সহজে শেষ হয় না যেমন—‘পরিবেশ দূষণের কারণগুলো বর্ণনা করো’ এমন প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত পুরো নম্বর পাওয়া কঠিন। তাই পরীক্ষার হলে তুমি কোন কোন প্রশ্নের উত্তর করবে, এটি নির্বাচনও একটি পরীক্ষা। পরীক্ষার সময় তোমাকে সতর্কতার সঙ্গে এসব বিষয় বিবেচনা করে উত্তর করতে হবে। তাহলেই পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া সহজ হবে।
উত্তরের উপস্থাপন কৌশল কেমন হবে: সাধারণভাবে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর উপস্থাপন করার সময় চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। বিষয়গুলো হলো—(ক) অবস্থান বা সংজ্ঞা (খ) গঠন (গ) কাজ এবং (ঘ) চিহ্নিত চিত্র। যেমন: মাইটোকন্ড্রিয়ার বর্ণনা লেখার জন্য প্রথমে এটি কী বা কোথায় পাওয়া যায়, এর গঠন, চিহ্নিত চিত্র এবং সবশেষে এর কাজ লিখতে হবে। চিহ্নিত চিত্র উত্তর কিছু অংশ লেখার পর দিলে ভালো হয়। একই প্রশ্নের বিভিন্ন অংশের উত্তর যেমন (ক), (খ) ও (গ) একই সঙ্গে পর পর লেখা উচত।
শেষে বলতে চাই, পরীক্ষার সময় খুব ধীর-স্থিরভাবে চিন্তা করে পরীক্ষা দেবে। কখনোই তাড়াহুড়া করবে না। যেসব প্রশ্নের উত্তর তুমি ভালো পারবে, সেগুলোর উত্তর আগে করবে। পরে বাকিগুলো চিন্তা করে উত্তর করবে। তোমাদের সবার মঙ্গল হোক, সবাই পরীক্ষায় অনেক অনেক ভালো করো—এ কামনা করছি।

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী | তারিখ: ২৯-০৩-২০১০

প্রথম আলো পত্রিকা

 Web Link:  জীববিজ্ঞান বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে যেভাবে প্রস্তুতি নেবে: ২৯-০৩-২০১০, প্রথম আলো

 

Web Link: http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2010-03-29/news/52375

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: